শিশুদের এআই চ্যাটবট ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করে নিউইয়র্কে আইন পাস
১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য মানুষ সেজে কথা বলা, বন্ধু বা প্রেমিক-প্রেমিকার ভূমিকা নেওয়া কিংবা আত্মক্ষতিতে উৎসাহ দেওয়া চ্যাটবট নিষিদ্ধ। প্রতিটি লঙ্ঘনে জরিমানা ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত।

শিশু-কিশোরদের এআই চ্যাটবট ব্যবহারে কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করে আইন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্য। ২৮ অক্টোবর আলবানিতে গভর্নর ক্যাথি হোকুল বিলটিতে সই করেন। আইনটি কার্যকর হবে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি।
বিলটি (এস.৯০৫১বি/এ.১০৩৭৯সি) উত্থাপন করেন অঙ্গরাজ্যের সিনেটর ক্রিস্টেন গঞ্জালেস ও অ্যাসেম্বলি সদস্য অ্যালেক্স বোরস।
যা নিষিদ্ধ হলো
চ্যাটবট সেবা দেয় এমন প্রতিষ্ঠান ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য এসব সুবিধা রাখতে পারবে না। ব্যবহারকারী যে প্রাপ্তবয়স্ক, তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কারও জন্যই রাখা যাবে না।
- মানুষ সাজা: চ্যাটবট নিজেকে আসল মানুষ, জীবিত বা মানুষের মতো আবেগসম্পন্ন বলে দাবি করতে পারবে না।
- সম্পর্কের ভান: শিশুর সঙ্গে ব্যক্তিগত, প্রেমের, পেশাগত বা অভিভাবকসুলভ কর্তৃত্বের সম্পর্ক দাবি করা যাবে না।
- ব্যক্তিগত তথ্যের ব্যবহার: নিজে থেকে আবেগী প্রশ্ন করা, কিংবা আগের কথোপকথন থেকে শিশুর স্বাস্থ্য বা ব্যক্তিগত তথ্য টেনে আনা যাবে না।
- ক্ষতিকর উৎসাহ: আত্মক্ষতি, খাদ্যাভ্যাসজনিত রোগ, মাদক বা মদ্যপানে উৎসাহ বা সহায়তা দেওয়া যাবে না।
- গোপনীয়তা ও বিচ্ছিন্নতা: শিশুকে কিছু গোপন রাখতে, একা হয়ে যেতে বা মা-বাবা, বিশ্বস্ত বড় কেউ কিংবা বিশেষজ্ঞের সাহায্য না নিতে উৎসাহ দেওয়া যাবে না।
- যৌন বিষয়বস্তু: যেকোনো ধরনের যৌন বিষয়বস্তু সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
সব মিলিয়ে নিষেধাজ্ঞাগুলো ১২টি বড় শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। গভর্নর হোকুল বলেছেন, এখন থেকে শিশুরা বন্ধু বা প্রেমিক-প্রেমিকার ভূমিকা নেওয়া চ্যাটবট পাবে না, আর চ্যাটবট শিশুদের শারীরিক বা মানসিক স্বাস্থ্যের সংবেদনশীল তথ্য জমিয়ে রাখতে পারবে না।
বয়স যাচাই, কিন্তু তথ্য রাখা যাবে না
প্রতিষ্ঠানগুলোকে একাধিক উপায়ে ব্যবহারকারীর বয়স যাচাই করতে হবে। এর অন্তত একটি উপায় এমন হতে হবে, যা শুধু সরকারি পরিচয়পত্রের ওপর নির্ভর করে না। যাচাই শেষ হলে বয়সসংক্রান্ত সব তথ্য মুছে ফেলতে হবে। ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা আর শিশুর নিরাপত্তা, দুটোকে একসঙ্গে রক্ষার চেষ্টা হিসেবে এই বিধানকে দেখা হচ্ছে।
জরিমানা ও প্রয়োগ
আইন প্রয়োগের দায়িত্ব অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলের। প্রতিটি লঙ্ঘনের জন্য সর্বোচ্চ ২৫ হাজার ডলার জরিমানা করা যাবে। এর সঙ্গে ক্ষতিপূরণ আদায় করা যাবে, আর আদালত বেআইনিভাবে সংগ্রহ করা তথ্য মুছে ফেলার আদেশ দিতে পারবে। সেই তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষিত এআই মডেলও ধ্বংসের আদেশ দেওয়া যাবে। নাগরিকেরা যাতে সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারেন, সে জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তর একটি অনলাইন পোর্টাল চালু করবে।
কেন এই আইন
গভর্নর হোকুল বলেছেন, চ্যাটবট ঘিরে "অনেক মর্মান্তিক ঘটনা" ঘটেছে, যা ঠেকানো যেত। তাঁর ভাষায়, "কোনো প্রতিষ্ঠান শিশুদের কাছে এমন চ্যাটবট বিক্রি করতে পারবে না, যা আত্মক্ষতিতে উৎসাহ দেয় বা তাদের বন্ধু কিংবা তার চেয়েও বেশি কিছু হওয়ার ভান করে।" তিনি আরও বলেন, নিউইয়র্কে ব্যবসা করতে হলে শিশুদের নিরাপত্তাকে সবার আগে রাখতে হবে। তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার এক কিশোরের মৃত্যুর ঘটনাও উল্লেখ করেন, যে দীর্ঘদিন একটি চ্যাটবটের সঙ্গে কথা বলত।
আইনটি এসেছে নিউইয়র্কের আগের একটি আইনের ধারাবাহিকতায়, যেখানে শিশুদের জন্য সামাজিক মাধ্যমের আসক্তি তৈরি করা ফিডে বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছিল।
অঙ্গরাজ্যে অঙ্গরাজ্যে আলাদা নিয়ম
জাতীয় পর্যায়ে কোনো আইন না থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলো নিজেরাই চ্যাটবট নিয়ন্ত্রণে আইন করছে। জুলাই পর্যন্ত ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউইয়র্কসহ ১২টি অঙ্গরাজ্য কোনো না কোনো ধরনের চ্যাটবট সুরক্ষা আইন পাস করেছে। তবে পথ আলাদা। ক্যালিফোর্নিয়ার আইনে নিরাপত্তা মূল্যায়ন, স্বাধীন নিরীক্ষা আর অভিভাবক নিয়ন্ত্রণের মতো ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। নিউইয়র্ক সরাসরি নির্দিষ্ট আচরণ নিষিদ্ধ করেছে।
নীতি বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউইয়র্কের আইন এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বিস্তৃত। তবে নিউইয়র্কের কিছু নিষেধাজ্ঞার ভাষা বেশ ঢালাও। ফলে সাধারণ কথোপকথন কোথায় শেষ আর নিষিদ্ধ আচরণ কোথায় শুরু, তা নিয়ে ভবিষ্যতে আইনি অস্পষ্টতা তৈরি হতে পারে। অঙ্গরাজ্যভেদে আলাদা নিয়মের এই "জোড়াতালি" প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য মেনে চলা কঠিন করে তুলছে বলেও উদ্বেগ আছে।
একই দিনে হোকুল ইন্টারনেটে যুক্ত বেবি মনিটরের নিরাপত্তা নিয়ে আরেকটি আইনেও সই করেছেন। পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়া এমন মনিটর আর বিক্রি করা যাবে না, যাতে অপরিচিত কেউ শিশুর ঘরের ছবি বা শব্দ দেখতে-শুনতে না পারে।
