মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
আজকের সংস্করণ:সকালদুপুরবিকেলরাত
সর্বশেষ

এআইয়ের দুই শিবিরের মাঝে বাংলাদেশ: একদিকে প্যাক্স সিলিকার আমন্ত্রণ, অন্যদিকে ওয়াইকোর পর্যবেক্ষক

একই দিনে ওয়াশিংটনের আমন্ত্রণ আর বেইজিংমুখী সিদ্ধান্ত। 'হয় এদিক, নয় ওদিক'-এর চাপ বাড়লে ঢাকার ভারসাম্যের কূটনীতি কঠিন পরীক্ষায় পড়বে।

দুই শিবিরের মাঝে বাংলাদেশ: প্যাক্স সিলিকা ও ওয়াইকো
প্রতীকী চিত্র: এআই নিউজবিডি

২০২৬ সালের ১ আগস্ট ঢাকায় দুটি ঘটনা প্রায় একসঙ্গে ঘটে, যা এআই প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থানকে আন্তর্জাতিক নজরে নিয়ে আসে।

সেদিন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত সার্জিও গোর। তিনি বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের বড় সম্ভাবনা আছে, আর ভবিষ্যতে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন প্যাক্স সিলিকা উদ্যোগের অংশীদার হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশের আগ্রহের কথা তুলে ধরেন।

একই দিনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, বাংলাদেশ চীনের নেতৃত্বে সাংহাইভিত্তিক বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহযোগিতা সংস্থায় (ওয়াইকো) পর্যবেক্ষক হিসেবে যোগ দেবে। সিদ্ধান্তের কারণ নিয়ে সরকার আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। প্যাক্স সিলিকার আমন্ত্রণের বিষয়ে প্রকাশ্য জবাবও আসেনি।

চাপ বাড়ছে

দুই সপ্তাহ পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। ফাঁস হওয়া একটি খসড়া মার্কিন চিঠির বরাতে জানা যায়, ওয়াশিংটন সহযোগী দেশগুলোকে বলতে চায় যে প্যাক্স সিলিকার সদস্য থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী এআই কাঠামোর সঙ্গে থাকা চলবে না। চিঠির ভাষ্য, "সবকিছুর অংশ হওয়া মানে কিছুরই অংশ না হওয়া।" চিঠিটি পাঠানো হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এখন পর্যন্ত কেবল কাজাখস্তান দুই জোটেই আছে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ এখনো প্যাক্স সিলিকায় সই করেনি, আর ওয়াইকোতে আছে পূর্ণ সদস্য নয়, পর্যবেক্ষক হিসেবে। ফলে আপাতত দুই দিকেই দরজা খোলা। কিন্তু প্যাক্স সিলিকায় যোগ দেওয়ার প্রশ্ন সামনে এলে ওয়াইকোর সঙ্গে সম্পর্ক কী হবে, সেই প্রশ্নও উঠবে।

কেন সিদ্ধান্তটি কঠিন

বাংলাদেশের অর্থনীতি দুই শক্তির সঙ্গেই গভীরভাবে জড়িত। তৈরি পোশাক রপ্তানির সবচেয়ে বড় একক বাজার যুক্তরাষ্ট্র। আবার কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি আর অবকাঠামোর জন্য সবচেয়ে বড় আমদানির উৎস চীন।

এআইয়ের ক্ষেত্রেও হিসাব দুই রকম। সরকার ১২ মাসের মধ্যে "সার্বভৌম এআই" অবকাঠামো চালুর লক্ষ্য ঘোষণা করেছে, যেখানে দেশীয় প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা ভাষার বড় ভাষা মডেল তৈরি করবে। এর জন্য উচ্চক্ষমতার জিপিইউ চিপ লাগবে। এই বাজারে মার্কিন প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য, আর সেগুলোর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ করে ওয়াশিংটন। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা জানিয়েছেন, সরকার-থেকে-সরকার আলোচনার মাধ্যমে চিপের উৎস নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে কোন দেশ থেকে, তা প্রকাশ করা হয়নি।

অন্যদিকে সাশ্রয়ী উন্মুক্ত এআই মডেল, প্রশিক্ষণ আর সক্ষমতা উন্নয়নে চীনের প্রস্তাব বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য বাস্তব সুবিধা আনতে পারে। ওয়াইকো ঠিক এই জায়গাটিকেই নিজের শক্তি হিসেবে তুলে ধরছে।

"সেতু" হওয়ার কূটনীতি

সরকারের বক্তব্যে ভারসাম্যের সুর স্পষ্ট। ৮ অক্টোবর ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিটের যৌথ আয়োজনে "এআই ও উদ্ভাবন সংলাপ" হয়। সেখানে পররাষ্ট্রসচিব বলেন, মূল প্রশ্ন হলো এআই কে নিয়ন্ত্রণ করে আর এর সুফল কে পায়। তাঁর ভাষায়, বাংলাদেশ শুধু এআইয়ের ভোক্তা হয়ে থাকতে চায় না, সুফল নিতে চায়, আর বৈশ্বিক অংশীজনদের মধ্যে সেতুর ভূমিকা রাখতে চায়।

বহুপক্ষীয় পরিসরেও বাংলাদেশ সক্রিয়। জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে এআই ও মানবাধিকার বিষয়ে প্রথম প্রস্তাবের মূল খসড়াকারী (পেনহোল্ডার) ছিল বাংলাদেশ। প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে। ইউনেসকোতেও বাংলাদেশ তার নিজস্ব পরিধির মধ্যে এআই নিয়ন্ত্রণের উপায় খোঁজার আহ্বান জানিয়েছে।

সামনে যা দেখার

  • প্যাক্স সিলিকা: ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণে সাড়া দেয় কি না।
  • ওয়াইকো: পর্যবেক্ষক থেকে পূর্ণ সদস্যপদের দিকে যায় কি না।
  • উন্নত চিপ: সার্বভৌম এআইয়ের চিপ কোন উৎস থেকে আসে।
  • ওয়াশিংটনের চাপ: মার্কিন অবস্থান আনুষ্ঠানিক শর্তে পরিণত হয় কি না।

এআই এখন কেবল প্রযুক্তির বিষয় নয়, পররাষ্ট্রনীতিরও কেন্দ্রীয় প্রশ্ন। দুই শিবিরের টানাপোড়েনে বাংলাদেশ কতটা স্বাধীনভাবে নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে পারে, সেটাই হবে আগামী দিনের বড় পরীক্ষা।