মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
আজকের সংস্করণ:সকালদুপুরবিকেলরাত
সর্বশেষ

প্যাক্স সিলিকা: চিপ, খনিজ আর এআই ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন জোট

সরবরাহ শৃঙ্খলে চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে যাত্রা শুরু। দশ মাসে দুই ডজনের বেশি দেশ, এখন সদস্যদের সামনে 'হয় এদিক, নয় ওদিক'-এর চাপ।

প্যাক্স সিলিকা: চিপ, খনিজ, জ্বালানি ও এআই সরবরাহ শৃঙ্খলের জোট
প্রতীকী চিত্র: এআই নিউজবিডি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে ক্ষমতার মাপকাঠি বদলাচ্ছে। একসময় তেলের পাইপলাইন আর সমুদ্রপথ যে ভূমিকা রাখত, এখন সেই জায়গা নিচ্ছে সেমিকন্ডাক্টর চিপ, বিরল খনিজ, বিদ্যুৎ আর ডেটা সেন্টার। এই বাস্তবতা থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে জন্ম নিয়েছে "প্যাক্স সিলিকা"। নামটি এসেছে লাতিন "প্যাক্স" (শান্তি) আর চিপের মূল উপাদান "সিলিকন" থেকে। ইতিহাসের "প্যাক্স রোমানা" বা "প্যাক্স আমেরিকানা"র মতো এই নামেও একধরনের বিশ্বব্যবস্থার ইঙ্গিত আছে: সিলিকননির্ভর শান্তি, যার কেন্দ্রে ওয়াশিংটন।

জন্ম: ওয়াশিংটন, ডিসেম্বর ২০২৫

২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর ওয়াশিংটনে প্রথম প্যাক্স সিলিকা সম্মেলনে জোটের ঘোষণাপত্র সই হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর একে এআই ও সরবরাহ শৃঙ্খল নিরাপত্তায় তাদের "প্রধান উদ্যোগ" বলে বর্ণনা করে। প্রথম সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের ডাকে অংশ নেয় জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও অস্ট্রেলিয়া। অতিথি হিসেবে ছিল তাইওয়ান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা ও ওইসিডি।

তালিকাটি লক্ষ করার মতো। এখানে আছে চিপ তৈরির যন্ত্রের সবচেয়ে বড় উৎস (নেদারল্যান্ডস), মেমোরি চিপের শীর্ষ নির্মাতা (দক্ষিণ কোরিয়া), উন্নত উপকরণ ও যন্ত্রাংশের শক্তি (জাপান), খনিজসম্পদ (অস্ট্রেলিয়া), আর এআই অবকাঠামোয় বিপুল পুঁজি ঢালা উপসাগরীয় দেশ। অর্থাৎ শুরু থেকেই জোটের নকশা ছিল চিপ সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপকে এক ছাতার নিচে আনা।

কী করতে চায় জোট

ঘোষণাপত্রে সদস্যরা কয়েকটি ক্ষেত্রে একসঙ্গে কাজের অঙ্গীকার করে:

  • গুরুত্বপূর্ণ খনিজ: উত্তোলন, পরিশোধন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ
  • চিপ: নকশা, উৎপাদন ও প্যাকেজিং
  • কম্পিউটিং ও জ্বালানি: কম্পিউটিং সক্ষমতা, বিদ্যুৎ গ্রিড ও উৎপাদন
  • অবকাঠামো: লজিস্টিকস, ফাইবার-অপটিক কেবল ও ডেটা সেন্টার
  • এআই: ভিত্তি মডেল ও অ্যাপ্লিকেশন

যৌথ বিনিয়োগ আর নতুন যৌথ উদ্যোগের কথাও আছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অঙ্গীকারটি হলো সংবেদনশীল প্রযুক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে "উদ্বেগজনক দেশগুলোর" অযাচিত প্রবেশ বা নিয়ন্ত্রণ থেকে রক্ষা করা। চীনের নাম কোথাও নেই, কিন্তু কাকে বোঝানো হচ্ছে তা স্পষ্ট। জোট নিজেকে "পজিটিভ-সাম" অংশীদারত্ব বলে, যার লক্ষ্য "জবরদস্তিমূলক নির্ভরতা" কমানো। এই শব্দবন্ধে মূলত বিরল খনিজে চীনের প্রায় একচেটিয়া আধিপত্যের দিকেই ইঙ্গিত।

২০২৬ সালের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ শৃঙ্খলে একটি বিনিয়োগ কনসোর্টিয়ামে ২৫ কোটি ডলার দেওয়ার পরিকল্পনা জানায়।

দ্রুত সম্প্রসারণ

প্রথম দশ মাসেই জোট দ্রুত বড় হয়েছে। জানুয়ারিতে কাতার ও আমিরাত সই করে। ফেব্রুয়ারিতে যোগ দেয় ভারত, যদিও শুরুর তালিকায় না থাকা নিয়ে দেশটিতে সমালোচনা হয়েছিল। এরপর একে একে আসে সুইডেন, ফিনল্যান্ড, ফিলিপাইন ও নরওয়ে। জুনে দ্বিতীয় সম্মেলনের সময় ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জার্মানি, গ্রিস, পর্তুগাল, এস্তোনিয়া এবং লাতিন আমেরিকার আর্জেন্টিনা, চিলি, কোস্টারিকা, এল সালভাদর ও পানামা যুক্ত হয়। সঙ্গে আসে মধ্য এশিয়ার প্রথম দেশ কাজাখস্তান। জুলাইয়ের শেষে যোগ দেয় ইতালি। এখন দুই ডজনের বেশি দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এর সদস্য।

মাঠের বাস্তবতা ও সমালোচনা

জোটের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রকল্প ফিলিপাইনের নিউ ক্লার্ক সিটিতে প্রস্তাবিত প্রায় চার হাজার একরের এআই ও উন্নত উৎপাদন কেন্দ্র। প্রকল্পটি দেখিয়ে দিয়েছে, জোটের প্রতিশ্রুতি মাটিতে নামলে কী ধরনের প্রশ্ন ওঠে:

  • কৃষিজমি: কৃষক ও মৎস্যজীবী সংগঠনগুলো জমি হারানোর আশঙ্কা জানিয়েছে।
  • পরিবেশ: পরিবেশবাদীরা বিদ্যুৎ ও পানির বিপুল চাহিদা নিয়ে সতর্ক করেছেন।
  • সার্বভৌমত্ব: অঞ্চলটিতে মার্কিন কর্মীদের জন্য বিশেষ আইনি সুবিধা নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। ফিলিপাইন সরকার সেই প্রস্তাব নাকচ করেছে, আর মার্কিন পক্ষ বলেছে তারা দায়মুক্তি নয়, আইনি নিশ্চয়তা চেয়েছিল।

ইউরোপেও আপত্তি আছে। কৌশলগত স্বাধীনতা হারানো এবং চীনে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কড়াকড়ির ফলে নিজেদের শিল্পের ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন কয়েকজন নীতিনির্ধারক। চিপ তৈরির যন্ত্রের নির্মাতা এএসএমএলের দেশ নেদারল্যান্ডসেও একই উদ্বেগ আছে।

"সবকিছুর অংশ হওয়া মানে কিছুরই অংশ না হওয়া"

২০২৬ সালের আগস্টে জোটের চরিত্র নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সামনে আসে। ফাঁস হওয়া একটি খসড়া মার্কিন চিঠির বরাতে জানা যায়, ওয়াশিংটন সহযোগী দেশগুলোকে বলতে চায়: প্যাক্স সিলিকার সদস্য থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী এআই কাঠামোর সঙ্গেও থাকা চলবে না। চিঠির ভাষা ছিল, "সবকিছুর অংশ হওয়া মানে কিছুরই অংশ না হওয়া।" চিঠিতে চীন বা ওয়াইকোর নাম ছিল না। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর "ফাঁস হওয়া অভ্যন্তরীণ নথি" নিয়ে মন্তব্য করেনি।

এই অবস্থান প্যাক্স সিলিকাকে একটি অর্থনৈতিক সহযোগিতা ফোরাম থেকে প্রযুক্তি-ভূরাজনীতির একটি শিবিরে পরিণত করার ইঙ্গিত দেয়। আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণাপত্রটি বাধ্যতামূলক নয়। কিন্তু উন্নত চিপ, বিনিয়োগ আর বাজারে প্রবেশাধিকারের প্রশ্ন জড়িত থাকায় এর রাজনৈতিক ওজন আইনি বাধ্যবাধকতার চেয়ে কম নয়। বাংলাদেশসহ যেসব দেশ দুই দিকেই সম্পর্ক রাখতে চায়, তাদের জন্য সামনের দিনগুলো সেই কারণেই কঠিন।