ওয়াইকো: সাংহাইয়ে চীনের বৈশ্বিক এআই সংস্থা, লক্ষ্য গ্লোবাল সাউথ
২০২৫ সালের প্রস্তাব থেকে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ২৯ দেশের প্রতিষ্ঠা চুক্তি। প্যাক্স সিলিকার পাল্টা হিসেবে দেখা এই সংস্থার হাতিয়ার উন্মুক্ত এআই আর সক্ষমতা উন্নয়ন।

যুক্তরাষ্ট্র যখন চিপ ও খনিজের সরবরাহ শৃঙ্খল ঘিরে মিত্রদের এক জোটে আনছে, চীন তখন ভিন্ন পথে হাঁটছে। তাদের কৌশল হলো উন্নয়নশীল বিশ্বকে সামনে রেখে একটি আন্তঃসরকারি এআই সংস্থা গড়া। এর নাম বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহযোগিতা সংস্থা, সংক্ষেপে ওয়াইকো (WAICO)।
প্রস্তাব থেকে প্রতিষ্ঠা
সংস্থাটির ধারণা প্রথম সামনে আনেন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সাংহাইয়ে বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্মেলনে। সে বছরের অক্টোবরে এপেক বৈঠকে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং প্রস্তাবটি আবার তোলেন। এক বছরের মাথায়, ২০২৬ সালের ১৬ জুলাই সাংহাইয়ে ২৯টি দেশ প্রতিষ্ঠা চুক্তিতে সই করে।
চীনের পক্ষে সই করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে ছিল:
- দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্য এশিয়া: পাকিস্তান ও কাজাখস্তান
- দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া: ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া
- অন্যান্য অঞ্চল: রাশিয়া, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা ও সেনেগাল
অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। জুলাইয়ের শেষে আরও আটটি দেশ যোগ দিলে সদস্যসংখ্যা দাঁড়ায় ৩৭। নতুনদের মধ্যে ইরান ও সুদানও আছে। ১ আগস্ট পর্যবেক্ষক হিসেবে যুক্ত হয় বাংলাদেশ।
কাঠামো
ওয়াইকো একটি আন্তঃসরকারি সংস্থা, সদর দপ্তর সাংহাইয়ে।
- সদস্য রাষ্ট্রের পরিষদ: সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা। নতুন সদস্য ও পর্যবেক্ষক নেওয়া, মহাসচিব নিয়োগ আর কার্যনির্বাহী গ্রুপ গঠনের ক্ষমতা এর হাতে।
- সচিবালয়: দৈনন্দিন কাজ চালায়। নেতৃত্বে একজন মহাসচিব ও দুজন উপমহাসচিব, প্রত্যেকের মেয়াদ তিন বছর।
সংস্থাটি নিজেকে সব সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য উন্মুক্ত বলে ঘোষণা করেছে। তবে এর মূল লক্ষ্য গ্লোবাল সাউথ, অর্থাৎ উন্নয়নশীল দেশগুলোর ডিজিটাল উন্নয়ন।
চীনের বার্তা: এআই "একক পরিবেশনা" নয়
প্রতিষ্ঠার পরদিন বিশ্ব এআই সম্মেলনে সি চিন পিং বলেন, এআই কোনো একটি দেশের "একক পরিবেশনা" হওয়া উচিত নয়। তিনি উন্মুক্ত (ওপেন সোর্স) এআইকে "ঐতিহাসিক সুযোগ" বলে বর্ণনা করেন। মানুষকেন্দ্রিক এআই আর এআইয়ের ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণের কথা বলেন। আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর সক্ষমতা গড়তে সহযোগিতা চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন।
এই বার্তার পেছনে বাস্তব হিসাব আছে। ডিপসিকের মতো চীনা উন্মুক্ত মডেল কম খরচে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হচ্ছে। যেসব দেশ উন্নত মার্কিন চিপ বা ব্যয়বহুল মার্কিন এআই সেবা সহজে পায় না, তাদের কাছে "উন্মুক্ত এআই আর সক্ষমতা উন্নয়ন" আকর্ষণীয় প্রস্তাব। প্যাক্স সিলিকা যেখানে সরবরাহ শৃঙ্খলে "বিশ্বস্ত অংশীদার" বেছে নিচ্ছে, ওয়াইকো সেখানে দরজা খোলা রাখার ভাষায় কথা বলছে।
দুই মডেলের পার্থক্য
| প্যাক্স সিলিকা | ওয়াইকো | |
|---|---|---|
| নেতৃত্ব | যুক্তরাষ্ট্র | চীন |
| মূল বিষয় | চিপ, খনিজ, জ্বালানি ও অবকাঠামোর সরবরাহ শৃঙ্খল | এআই শাসন, সহযোগিতা ও সক্ষমতা উন্নয়ন |
| সদস্য বাছাই | "বিশ্বস্ত অংশীদার" | সব সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য উন্মুক্ত |
| আইনি রূপ | বাধ্যবাধকতাহীন ঘোষণাপত্র | সদর দপ্তর ও সচিবালয়সহ আন্তঃসরকারি সংস্থা |
| মূল আকর্ষণ | উন্নত চিপ, বিনিয়োগ, মার্কিন বাজার | উন্মুক্ত মডেল, প্রশিক্ষণ, গ্লোবাল সাউথের কণ্ঠ |
সংশয় ও সমালোচনা
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ওয়াইকো বাস্তবে এআই শিল্পকে বাধ্যতামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে না। এর কাজ হবে মূলত কারিগরি সহযোগিতা আর সক্ষমতা উন্নয়ন। কেউ কেউ মনে করেন, এই সংস্থার মাধ্যমে চীন বিভিন্ন দেশে দ্বিপক্ষীয় এআই সহযোগিতা কেন্দ্র বাড়াবে এবং জাতিসংঘে এআই নীতির আলোচনাকে নিজের মতো করে প্রভাবিত করবে। এ বিষয়ে কার্নেগি এনডাওমেন্টের বিশ্লেষক অরিন্দ্রজিৎ বসু লিখেছেন, বৈশ্বিক এআই ও সাইবার নীতি নির্ধারণ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসায় বেইজিংয়ের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
উন্নয়নশীল দেশের ভেতর থেকেও প্রশ্ন আছে। ইন্দোনেশিয়ার এক বিশ্লেষক সতর্ক করেছেন, হার্ডওয়্যার, কম্পিউটিং ক্ষমতা আর ভিত্তি মডেল যদি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতেই থেকে যায়, তাহলে "এআই বিভাজন" আরও গভীর হবে। তাঁর মতে, ওয়াইকোকে সত্যিই গ্লোবাল সাউথের পক্ষে দাঁড়াতে হবে।
এক বছরেরও কম সময়ে ৩৭ সদস্য আর পর্যবেক্ষকের সারি দেখিয়ে দিচ্ছে, এআই শাসনের প্রশ্নে বিশ্ব এখন দুই ধারায় ভাগ হচ্ছে। কাজাখস্তানের মতো কিছু দেশ দুই জোটেই আছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের "হয় এদিক, নয় ওদিক" অবস্থান কড়া হলে সেই মাঝামাঝি জায়গা ছোট হয়ে আসতে পারে।
